বিদেশি পাখি পালন করে স্বাবলম্বী

পাখির কিচির মিচির শুনতে কার না ভালো লাগে। তবে সেটা যদি হয়, নানা প্রজাতির বাহারি রঙের বিদেশি পাখি, তাহলে তো কথাই নেই। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পৌর শহরের গড়কান্দা এলাকার মনিরুজ্জামান মনির নামে এক যুবক শখের বশে পাখি পালন করেন। তবে শখ থেকে এখন বানিজ্যিক ভাবে বিদেশি পাখি পালন ও বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি।

মনিরের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ছোট বেলা থেকেই পাখি পালনের প্রতি নেশা ছিল তার। তবে দেশি পাখি পালনের ধরা বাঁধা নিয়ম রয়েছে। তাই যেসব পাখি খাঁচাতেই জন্ম ও বড় হয়ে থেকে সেসব বিদেশি পাখির প্রতি তার আগ্রহ বেড়ে যায়।

তাই চার বছর আগে ইন্টারনেটে খোঁজ খবর নিয়ে ঢাকা থেকে ‘পাজিরা’ নামে চার জোড়া বিদেশি পাখি ক্রয় করেন। এর পর থেকে এই পাজিরা পাখির লালন পালন করতে থাকেন। পরে পাজিরা পাখি বাচ্চা জন্ম দিলে, সেগুলো বিক্রি করত মনির। আর এ টাকা দিয়ে বিভিন্ন রকমের বিদেশি পাখি ক্রয় করতেন।

আস্তে আস্তে তিনি বিদেশি পাখির খামার বড় করতে থাকেন। বর্তমানে তার খামারে লাভ বার্ড, গোল্ডেন পেইন, র‌্যাম, ককাটেল, টারকুইজিন প্যারাকিট, হ্যান’স ম্যাকাও, রেইনবো লোরিকিটসহ ৮-১০ প্রজাতির প্রায় ২০০ বিদেশি পাখি রয়েছে।

এই সব বিদেশি পাখি বিক্রি করে মনির প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০-৩০ হাজার টাকা উপার্জন করেন বলে জানা গেছে। এছাড়া বিদেশি পাখি পালনের পাশাপাশি মনিরের খামারে রয়েছ টার্কি মুরগি ও লাড়াইয়ের জন্য মোরগ। এই গুলোও পালন ও বিক্রি করে থাকেন তিনি।

পাখি প্রেমিক মনিরের দেখাদেখি উপজেলার অনেক যুবকই এই বিদেশি পাখি পালনের দিকে ঝুঁকছেন। পাখি প্রেমী মনিরুজ্জামান মনির বলেন, আমি পাখি বিক্রি করে গত মাসেও ৪০ হাজারের মতো টাকা উপার্জন করেছি। শুধু তাই নয়, এই পাখির টাকা দিয়েই বাড়ি ঘর সংস্কার করেছি।

তাই আমি মনে করি, যারা বেকার রয়েছেন, তারা যদি স্বল্প পুঁজি দিয়ে বিদেশি পাখি পালন করেন, তাহলে অতি সহজেই স্বাবলম্বী হতে পারবেন। শুধু তাই নয়, এই পাখি পালনের মাধ্যমে দেশে হতাশা ও নেশা গ্রস্থ যুবকদের সঠিক পথে আনা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

বাড়িতে বিদেশি পাখির খামার করে বেকার যুবক ময়বুর আলম জীবন এখন স্বাবলম্বী। পিতার আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি। কীভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায় এ চিন্তায় বিভোর জীবন টিভিতে ডিসকভারি চ্যানেল দেখে পাখি পালনে উৎসাহিত হন।

নিজ বাড়িতে গ্রামীণ প্রযুক্তিতে অল্প টাকায় বিদেশি প্রজাতির পাখির খামার তৈরি করেন। আর এই পাখির খামার পাল্টে দেয় জীবনের জীবন মোড়। এখন তার খামারে বাজারিকা, লাভ বার্ড, কোকাটিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে। এ পাখি পালন করে এখন প্রতি মাসে তার ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা উপার্জন হয়।

‘পাখি নিধন নয়, পালনেই আনন্দ’- এই মানসিকতাকে সামনে রেখে অজোপাড়াগাঁয়ে পাখি পালনের খামার করে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব তা প্রমাণ করেছেন দিনাজপুর সদর উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের মো. আনিছুর রহমানের ছেলে মো. ময়বুর আলম জীবন।

পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতার অভাবে তিনি মাত্র অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছেন। জীবন জানান, লেখাপড়া কম আর চাকরি না পাওয়ায় টিভিতে ডিসকভারি চ্যানেল দেখে পাখি পালনে উৎসাহিত হয়ে নিজ বাড়িতে গ্রামীণ প্রযুক্তিতে অল্প পুঁজিতে বিদেশি প্রজাতির পাখি পালন শুরু করেন।

ঘরের মধ্যে হাঁড়ি দিয়ে হাঁড়ির ভেতর পাখির বাসা বানিয়ে পাখি রাখেন। সেই হাঁড়িতেই পাখি ডিম দেয় এবং বাচ্চা ফুটায়। বর্তমানে তার খামারে ২০০ জোড়া পাখি রয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে পাখি ক্রয় করে নিয়ে যায়।

এখন প্রতি মাসে পাখি বিক্রি হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার। জীবন জানান, প্রতি জোড়া পাখি বিক্রি হয় ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা। তিনি জানান, সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে এ অঞ্চলের বেকার যুবক-যুবতীদের পাখি পালন প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার কাজ করবেন।

দিনাজপুর শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার মৃত মারফত আলী বেপারীর ছেলে আলী আকবর। তিনি বাড়িতে বিদেশি পাখির খামার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। শখ করে পাখি পুষতে পুষতে খামার করেছেন।

এখন তিনি এ খামার থেকে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। আকবর জানান, তিনি টিভির ডিসকভারি চ্যানেল দেখে পাখি পালনে উৎসাহী হন। তারপর নিজ বাড়িতে গ্রামীণ প্রযুক্তিতে অল্প টাকায় বিদেশি প্রজাতির পাখির খামার তৈরি করেন।

এ পাখির খামারই আর্থিক সাফল্য এনে দিয়েছে। এখন খামারে ১৫ প্রজাতির ৩০ জোড়া কবুতর, ১০ জোড়া ঘুঘু, ৫০ জোড়া বাজারিকা, লাভ বার্ডসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে। আলী আকবর বলেন, ‘আমার একটি ছোট ওয়ার্কশপ আছে। এর পাশাপাশি ডিসকভারি চ্যানেল দেখে বিদেশি প্রজাতির পাখি পালন শুরু করি।’

আজকে যারা শিক্ষিত হয়ে বেকারত্ব নিয়ে ঘুরছেন তারা পশুপালনের ফার্ম দিলে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারবেন। তার ফার্ম থেকে এখন সব খরচ বাদে প্রায় অর্ধ লাখ টাকা লাভে থাকে। এছাড়া আজকের বেকার যদি উদ্যোক্তা হন তাহলে আগামীতে আরো বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন। © বিডিভিউ টোয়েন্টিফোর ডটকম