খাঁচায় বন্দি করে পশু-পাখি পালন কি জায়েজ?

মুফতি মোস্তফা কামাল কাসেমি
চিত্তবিনোদন ও শখের বশে খাঁচায় বন্দি করে পশু-পাখি লালন-পালন করা ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ। (আহকামুল হাশারাত : ৫৩) হাদিসে এসেছে, হজরত আনাস (রা.) এর ছোটভাই আবু উমায়ের শৈশবে একটা বুলবুলি পাখি পুষতো এবং তার সঙ্গে খেলা করতো।

একদিন পাখিটি মারা গেলে তার মনটা বড্ডো খারাপ হয়ে যায়। তখন রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে গিয়ে তাকে আনন্দ দেয়ার উদ্দ্যেশ্যে বললেন, ‘হে আবু উমায়ের! তোমার ছোট বুলবুলিটির কি হলো?’ (বুখারি : ৬১২৯)

তবে পালিত পশু-পাখিকে যথাযথ আহার দান, সঠিক যত্ন নেয়া এবং তার যেনো কোনোপ্রকার কষ্ট না হয় সেদিকে ভালোভাবে খেয়াল রাখতে হবে। কেননা কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেয়ায় ইসলাম নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ইসলাম একজন মানুষের জন্যে যেমন সকল প্রকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, তেমনি একটা প্রাণীকেও দিয়েছে সকল আঘাত ও কষ্ট থেকে নিরাপত্তা।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় পশু-পাখির প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে বলেছেন। অকারণে তাদের মেরে ফেলা, তাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানো, নিজেদের মনোরঞ্জনের জন্য কষ্ট দেয়াকে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর অভিশাপ সেই ব্যক্তির ওপর, যে অকারণে পশুর অঙ্গহানী ঘটায়।’ (মুসনাদে আহমদ: ৪৩২) তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কারণ ছাড়াই কোনো পাখি হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার হিসাব নেবেন।’ (ইবনে মাজাহ : ৫৪৬)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ‘এসব বাকশক্তিহীন প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ অবস্থায় এগুলোতে আরোহণ করো, সুস্থ অবস্থায় আহার করো।’ (আবু দাউদ: ২৫৪৮) অন্য একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এক মহিলা একটি বিড়াল বেঁধে রেখে খেতে না দেওয়ায় মারা যায়। ফলে মহিলাটিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়।’ (বুখারি : ৩৩১৮)

ইসলাম মনে করে, পৃথিবীতে মানুষের পরেই প্রাণিজগতের স্থান। প্রাণিজগৎকে পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি দিয়ে পবিত্র কুরআন বলছে, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী আছে, আর যত পাখি দুই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, তারা সবাই তোমাদের মতো একেক জাতি।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৩৮)

পবিত্র কুরআনে বিক্ষিপ্তভাবে প্রায় ২০০ আয়াতে প্রাণিজগতের প্রসঙ্গ এসেছে। এমনকি পৃথকভাবে বিভিন্ন প্রাণীর নামে ছয়টি সূরার নামকরণ করা হয়েছে। যেমন—সূরা বাকারা (গাভি), সূরা আনআম (উট, গরু, বকরি), সূরা নাহল (মৌমাছি), সূরা নামল (পিপীলিকা), সূরা আনকাবুত (মাকড়সা), সূরা ফিল (হাতি) ইত্যাদি।

এসব নামকরণ থেকে প্রাণিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট ফুটে ওঠে। প্রণীদের প্রতি দয়া প্রদর্শনও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যেকোনো প্রাণীর ওপর দয়া করার মধ্যেও সওয়াব আছে।’ (বুখারি : ৬০০৯)

সুতরাং পশু-পাখির সঙ্গে যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবে না। পশুপাখিকে অহেতুক নিশানা বানানো ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহেতুক কোনো চড়ুই পাখি হত্যা করে, কিয়ামতের দিন পাখিটি আল্লাহর কাছে এই বলে নালিশ করবে যে, হে আল্লাহ, অমুক ব্যক্তি আমাকে অহেতুক হত্যা করেছে।’ (নাসায়ি : ৬৭৫)

পরিশেষে বলবো, সঠিক যত্নের সঙ্গে পশু-পাখি খাঁচায় বন্দি করে পালন করা ইসলামের দৃষ্টিতে যদিও জায়েজ, কিন্তু এর দ্বারা তাদের বিচরণের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। তাই তাদের বন্দি না বানিয়ে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়াই উত্তম। হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো এক সফরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম।

এক জায়গায় আমরা একটি চড়ুই পাখিকে দুটি বাচ্চাসহ দেখতে পেলাম। আমরা বাচ্চা দুটিকে হাতে তুলে নিলাম। ফলে মা পাখিটি অস্থির হয়ে আমাদের মাথার ওপর ঘোরাঘুরি করতে লাগল। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, ‘বাচ্চা ছিনিয়ে নিয়ে কে তাকে কষ্ট দিয়েছে? তার বাচ্চা তাকে ফিরিয়ে দাও।’ (আবু দাউদ : ৫৩৫৬)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Close